Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: রক্তক্ষয়ী সীমান্ত-সহিংসতা, অসম শক্তির ভারসাম্য ও এশিয়া জুড়ে প্রভাবের প্রতিযোগিতা—এই তিনেই চিন্তিত ভারত–চিন সম্পর্ক(US On India China Relations)। তবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্কযুদ্ধ এমন এক অপ্রত্যাশিত সমীকরণের দুয়ার খুলতে পারে, যা দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠেলে দিচ্ছে সাবধানী কিন্তু কৌশলগত এক আলিঙ্গনে।
শুল্কের ঝাঁকুনি, ২৫% থেকে ৫০%—বার্তা কীসের? (US On India China Relations)
ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর নতুন বেস ট্যারিফ ২৫% ঘোষণা করেছেন—আবার রাশিয়া থেকে তেল কেনার “শাস্তি” হিসেবে এটি পরে ৫০%-এ উন্নীত হবে বলে হুশিয়ারিও দিয়েছে(US On India China Relations)ন। এই কৌশল অনেকটাই চিনের বিরুদ্ধে বহুবর্ষজুড়ে চালানো চাপ-প্রচারণার প্রতিধ্বনি, ফলে দিল্লি ও বেইজিং—দু’পক্ষেরই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার মিলিত অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–চিনের ইতোপূর্বেই চলমান উত্তেজনার বরফ গলতে শুরু করা সম্পর্কের মধ্যে ট্রাম্পের পদক্ষেপ আরও ত্বরান্বিত করেছে।
ওয়াশিংটনের ‘লেনদেন-রাষ্ট্রনীতি’ ও নতুন বাস্তবতা (US On India China Relations)
নতুন দিল্লি ও বেইজিং এখন এমন এক ওয়াশিংটনের মুখোমুখি, যা ইউরোপ–এশিয়া জুড়ে কৌশলগত মিত্র ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—উভয়কেই একই ‘লেনদেন-মনোভাব’ দিয়ে বিবেচনা করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘদিন ভারতের ওপর নির্ভর করে চীনকে ‘ভারসাম্য’ করার যে কৌশল গড়েছিল, সেটিই ধাক্কা খাচ্ছে; ফাঁক গলে বেইজিংয়ের জন্য দিল্লির কাছে নতুন রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এসসিও শীর্ষ বৈঠক মঞ্চে প্রতীকী বার্তা (US On India China Relations)
এই কৌশলগত ‘পুনর্গঠন’কে প্রখর করেছে খবর—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাত বছরে প্রথমবারের মতো মাসের শেষে চীনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে পারেন(US On India China Relations)। বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, তিয়ানজিনের বৈঠক “ঐক্য, বন্ধুত্ব ও ফলপ্রসূতার” মঞ্চ হবে। যদিও পর্যবেক্ষকদের সতর্ক বার্তা—এটি বিশ্বাসের জোট নয়; সুবিধা–বিবেচনার, বা ‘অ্যালায়েন্স অব কনভিনিয়েন্স’-এর আলামত।
অবিশ্বাসের দীর্ঘ ছায়া এবং সংঘর্ষ, সীমান্ত সমস্যা (US On India China Relations)
হিমালয় ঘেঁষে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ডোকলাম–লাদাখের টানাপোড়েন, এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা—এই পুরনো বাস্তবতা অপরিবর্তিত। তাই আপাত-উষ্ণতা বাড়লেও ভিত্তির গভীরে সন্দেহ রয়ে গেছে। এ কারণেই বিশ্লেষকদের ধারণা—ভারত–চীন সম্পর্কের ‘স্বল্প-মেয়াদি তাপ’ মূলত ওয়াশিংটনের কঠোরতার প্রতি প্রতিক্রিয়া; স্থায়ী সমঝোতার নয়।

আরও পড়ুন : US Warship : স্কারবোরো শোয়ালে মার্কিন FONOP অভিযান! যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়াবে চিন ?
ভারত–মার্কিন সম্পর্ক (US On India China Relations)
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী শীতলতা পেরিয়ে ২১শ শতকে এসে দিল্লি–ওয়াশিংটন জোট গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নেয়। ২০১৪-তে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ব্যক্তিগত সখ্যও সম্পর্ককে উঁচুতে তুলেছিল(US On India China Relations)। ২০২০ সালের প্রাণঘাতী ভারত–চীন সীমান্ত সংঘর্ষ ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো অনিবার্য করে তোলে; বাইডেন প্রশাসন তখন ভারতকে ইন্দো–প্যাসিফিকে চীনা প্রভাবের ভারসাম্যরক্ষী হিসেবে দেখা শুরু করে। মানবাধিকার ইস্যুতে সমালোচনা থাকলেও কৌশলগত অগ্রাধিকারই প্রাধান্য পায়।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’–এর নতুন রূপ ও দিল্লির দিকে শূল (US On India China Relations)
কিন্তু ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আরও আক্রমণাত্মক চেহারা নিয়েছে—চীনকে ছাড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুতে এসেছে ভারতও। রাশিয়ান তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য ভাষায় দিল্লিকে ভর্ৎসনা, ভারতের অর্থনীতিকে “মৃত” আখ্যা, এবং ইতিহাসে সর্বোচ্চ মার্কিন শুল্কারোপ—সব মিলিয়ে দিল্লির আস্থায় বড় চিড় ধরেছে। ভারতের জ্বালানি আমদানির ৩৬% যেখানে রাশিয়া-নির্ভর—সেখানে হঠাৎ ২৫–৫০% শুল্ক ভারতের প্রবৃদ্ধি–চাহিদার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
দিল্লির পাল্টা ‘অন্যায্য–অযৌক্তিক’ ও কৃষক–মৎস্যজীবীর স্বার্থ
মোদি সরকার শুল্ককে “অন্যায্য” ও “অযৌক্তিক” বলছে; পাল্টা যুক্তি—পশ্চিমা দেশগুলোও রুশ সার–রাসায়নিক কেনা অব্যাহত রেখেছে(US On India China Relations)। ট্রাম্প বহুদিন ধরেই ভারতকে “ট্যারিফ কিং” বলেন; কিন্তু ভারতীয় কর্মকর্তারা পাল্টা জানান—কয়লা, ওষুধ, বিমানযন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি—অনেক মার্কিন পণ্যে ভারত ‘শূন্য থেকে নিম্ন’ শুল্ক রাখে। কৃষিপণ্যে অবশ্য ভারতের গড় সরল শুল্ক ৩৯%—মার্কিন ৫%-এর তুলনায় বেশি—কিন্তু দিল্লির যুক্তি, এটি খাদ্য-নিরাপত্তা ও ক্ষুদ্র কৃষকের সুরক্ষায় নীতিগত ঢাল।

আরও পড়ুন : US On Operation Sindoor : ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ এফ-১৬ ধ্বংস বিতর্কে মুখ খুললো যুক্তরাষ্ট্র
‘কঠোর’ কূটনীতি ও সীমিত ছাড়ের জায়গা (US On India China Relations)
ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য ভর্ৎসনা দিল্লির জন্য রাজনৈতিকভাবে জটিল। দেশীয় বিরোধীদের চাপের মুখে মোদি (Narendra Modi) সম্প্রতি বলেন, “কৃষক, জেলে, দুগ্ধচাষীর স্বার্থে ভারত কখনো আপস করবে না… ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হলেও আমি প্রস্তুত।” নীতি–কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘টুইটার–মাইক’–নির্ভর কৌশল দিল্লির চড়াই–উতরাই সামলানোর জায়গা কমিয়ে দিচ্ছে—এমনই মত দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্কগুলোর।
বেইজিংয়ের দিকে উষ্ণ সঙ্কেত (US On India China Relations)
গত অক্টোবরে রাশিয়ায় ব্রিকসের ফাঁকে মোদি–শি বৈঠকের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় ফেরা শুরু—সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট পুনরারম্ভে সম্মতি, পাঁচ বছর পর তিব্বতের দু’টি তীর্থপথ ভারতীয়দের জন্য ফের খোলা, একে–অপরের পর্যটন ভিসা পুনরায় ইস্যু। ভারতে প্রবৃদ্ধি মন্থরতা ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগে ধাক্কা—এ দু’টিও দিল্লিকে বাণিজ্য–বিনিয়োগে চীনের সঙ্গে সীমিত উষ্ণতা বিবেচনায় উৎসাহ দিচ্ছে।
সমাধান কোথায়?(US On India China Relations)
তবে সীমান্ত–সংঘাতের ক্ষত শুকায়নি, পাকিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রোথিতি—সব মিলিয়ে ‘বিশ্বাসের ঘাটতি’ প্রবল। ফলে অনেকে ধারণা করছেন—আগামী দিনে ভারত–চীন সম্পর্কে ‘দুই ধারার’ বাস্তবতা—বাণিজ্য–বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়লেও নিরাপত্তা–কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত থাকবে। দিল্লির কাছে তাই কোনো ‘বড়’ জোট নয়, বরং ‘ক্ষুদ্র, গণিত-নির্ভর’ সহাবস্থানই বাস্তবসম্মত।
যুক্তরাষ্ট্রের চিন নীতি কৌশল–শূন্যতা? (US On India China Relations)
পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের চীন-নীতি সুশৃঙ্খল কোনো নকশায় বাঁধা নয়; ফলে চীন-প্রতিরোধে ভারতের ভূমিকা ‘কম মূল্যায়িত’(US On India China Relations)। রাশিয়া–অভিমুখে হাওয়া বদলাতেই ভারতের তেল আমদানি ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে গেছে। কিন্তু এর মূল্য হতে পারে ইন্দো–প্যাসিফিকের সেই দুই দশকের পরিশ্রমে গড়া স্তম্ভের ফাটল—যার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল কোয়াড, সরবরাহ–শৃঙ্খল বৈচিত্র্য, ও নিয়মভিত্তিক সমুদ্র–শাসন।
দিল্লির ক্যালকুলাসে একযোগে দুই সমীকরণ
ভারত জানে, চীনের সঙ্গে স্থায়ী নিরাপত্তা–সমঝোতা দুরূহ; আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী বিরোধও অযৌক্তিক। তাই দিল্লির লক্ষ্য—দ্বিমুখী ভারসাম্য: অর্থনীতিতে সীমিত চীন-সম্পৃক্ততা, নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র–ইন্দো–প্যাসিফিক আর্কিটেকচার বজায় রাখা। এ কারণেই দিল্লি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতে পা বাড়াবে না, কিন্তু শুল্ক–চাপের জবাবে ‘স্বার্থ-সঙ্গত’ হিসেব কষবে—কখন কোথায় ছাড়, কোথায় কঠোরতা।
সামনে কী?(US On India China Relations)
ট্রাম্পের শুল্ক–ঝাঁকুনিতে যা হয়তো দশকের কূটনীতিতেও সম্ভব হয়নি—ভারত–চীনের মধ্যে এক সাবধানী কৌশলগত সান্নিধ্য—তা আপাতত বাস্তব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর স্থায়িত্ব নির্ধারিত হবে তিন কেন্দ্রে: ওয়াশিংটনের কৌশল কতটা সুশৃঙ্খল হয়; বেইজিং সীমান্তে উত্তেজনা কতটা নামায়; আর দিল্লি কতটা দক্ষতায় দুই মেরুর লাভ–ক্ষতি মেলাতে পারে। আপাতত ছবিটা স্পষ্ট—বিশ্বাস নয়, প্রয়োজনে আঁটা এক জোট; যেখানে বাণিজ্যের নরম উষ্ণতা ও নিরাপত্তার ঠান্ডা দূরত্ব পাশাপাশি হাঁটছে।