Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে ক্ষমতা পুনর্দখলের চতুর্থ বর্ষপূর্তি সর্বৈব জাঁকজমকে পালন করল তালিবান(Afghan Taliban)। শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানী কাবুল, উত্তরের সার-ই-পুল, দক্ষিণের কন্দহরসহ একাধিক শহরে সামরিক কুচকাওয়াজ, পতাকা উত্তোলন, ধর্মীয় সংগীত ও প্রার্থনায় দিনটি চিহ্নিত হয়। রাজপথে ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, মোটরবাইক ও পিক-আপ ট্রাকে সওয়ার সশস্ত্র যোদ্ধাদের মিছিল—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি ছিল তালিবান শাসনের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের আখ্যান। ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী রেখে যাওয়া একটি হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির আয়োজনও দেখা যায়, যা প্রতীকীভাবে ‘বিদেশি দখলের অবসান’ উদ্যাপন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কাবুলের কেন্দ্র থেকে প্রদেশ—‘শক্তি-পরিক্রমা’ (Afghan Taliban)
কাবুলের কেন্দ্রস্থলে তালিব যোদ্ধাদের হাতে সাদা-কালো পতাকা, কাঁধে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মাথায় পাগড়ি—প্রশাসনিক ভবন, ঐতিহাসিক চত্বর ও প্রধান সড়ক ঘিরে ছিল নিরাপত্তার ঘন বেষ্টনী(Afghan Taliban)। উত্তরে সার-ই-পুল ও দক্ষিণে কন্দহরেও ছিল একই চিত্র—সামরিক কুচকাওয়াজের সঙ্গে ‘ইসলামিক আমিরাত’-এর স্লোগান, ধর্মীয় শ্লোকপাঠ এবং বিজয়োৎসব। তালিবান নেতৃত্ব বার্তা দেয়, ‘দেশজুড়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত’, এবং ‘বিদেশি হস্তক্ষেপের অধ্যায় সমাপ্ত’।
নারীদের ‘প্রবেশ নিষেধ’ (Afghan Taliban)
বর্ষপূর্তির সরকারি অনুষ্ঠানে আফগান নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়; অনুমতি দেওয়া হয়নি বিদেশি মহিলা সাংবাদিকদেরও(Afghan Taliban)। তালিবান আমলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত সীমিত হয়ে এসেছে—এই নিষেধাজ্ঞা সেই বিতর্ককে নতুন করে উস্কে দিল। নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ‘উদ্যাপনের উৎসব’ আসলে ‘অধিকার সংকোচনের মুখোশ’; মেয়েদের মাধ্যমিকের ঊর্ধ্বে পড়াশোনায় নিষেধাজ্ঞা, মহিলাদের বহু সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণে বাধা এবং গণ-অঙ্গনে চলাচলের বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে জনজীবনে নারীর উপস্থিতি প্রান্তিক।
রাতভর ধর্মীয় সংগীত, দিনভর ‘বিজয়’–উৎসব (Afghan Taliban)
বর্ষপূর্তির আগের রাত থেকে কাবুলজুড়ে লাউডস্পিকারে ধর্মীয় সংগীত বাজতে থাকে। ভোর থেকে শুরু হয় প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। রাজপথের পাশে অস্থায়ী মঞ্চে ধর্মীয় বক্তৃতা, মধ্যাহ্নে অস্ত্র-শোভাযাত্রা, বিকেলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সর্বত্রই ‘স্বাধীনতা’ ও ‘শরিয়তি শাসন’ প্রতিষ্ঠার দাবি। বহু স্থানে সশস্ত্র যোদ্ধাদের নাচগানের দৃশ্যও নজরে পড়ে—যা একদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রদর্শন, অন্যদিকে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৯৯৬ থেকে ২০২১—পতন আর প্রত্যাবর্তন (Afghan Taliban)
আফগানিস্তানে (Afghanistan) তালিবানের উত্থান ১৯৯০–এর দশকে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার কাবুল দখল করে তারা। কিন্তু ২০০১ সালের ৯/১১–এর পর আমেরিকার নেতৃত্বাধীন অভিযানে তাদের শাসনের পতন ঘটে। দীর্ঘ দুই দশকের সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা পেরিয়ে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট (বাস্তবে ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে) মার্কিন প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে তালিবান ফের কাবুলে প্রবেশ করে এবং ক্ষমতা নেয়। সেই ‘পুনর্দখল’-এর চতুর্থ বর্ষপূর্তিই এবার উদ্যাপিত হল রাষ্ট্রীয় সাজে-গোজে।
‘প্রশাসনিক পরিবর্তন’–এর ইঙ্গিত (Afghan Taliban)
সরকারি তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের মুখপাত্র হাবিব ঘোফরান জানান, সামনে কিছু ‘প্রশাসনিক পরিবর্তনের’ পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের ঢেউ নারীদের শিক্ষার অধিকার—বিশেষত ষষ্ঠ শ্রেণির ওপরে পড়াশোনার অনুমতি—ছুঁতে পারবে কিনা, তা স্পষ্ট করেননি কেউই। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল হবে নাকি কড়াকড়িই থাকবে—সেই প্রশ্নই এখন কেন্দ্রীয়।
অর্থনীতি, মানবিক সংকট ও নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা (Afghan Taliban)
রাজনৈতিক ‘স্থিতিশীলতার’ বার্তার আড়ালে আফগানিস্তানের অর্থনীতি চাপে(Afghan Taliban)। ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার টানাপোড়েন, খরা ও খাদ্য–নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে মানবিক পরিস্থিতি নাজুক। গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ রেমিট্যান্স ও সাহায্যনির্ভর; শহরে বেকারত্ব উচ্চ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় মন্দা। তালিবান প্রশাসন কর আদায় ও সীমান্ত-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ বাড়ালেও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক-আইনি নিশ্চয়তার অভাব বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন : Trump Putin Meeting : ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা নাকি নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ ?
আইএস–কে ও ছায়াযুদ্ধ (Afghan Taliban)
তালিবানের সাথে ‘আইএস–খোরাসান’-এর দ্বন্দ্ব বহু পুরনো(Afghan Taliban)। রাজধানী ও প্রাদেশিক শহরগুলোতে বিচ্ছিন্ন হামলার ঝুঁকি রয়েছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে চোরাচালান, অস্ত্র-চক্র ও স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য টালমাটাল স্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এ অবস্থায় প্রকাশ্য শক্তি-প্রদর্শন একদিকে মনোবল বাড়ালেও অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে অস্বীকার করে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া (Afghan Taliban)
বহু দেশ এখনও ‘ইসলামিক আমিরাত’-কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। স্বীকৃতির শর্ত হিসেবে নারীর শিক্ষা–কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা, সন্ত্রাসদমন ও মানবাধিকার সম্মান—এই চারটি স্তম্ভ বারবার উঠে আসে(Afghan Taliban)। তালিবান প্রশাসন অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে বাইরের ‘শর্ত’ মানতে অনীহা দেখালেও অর্থনীতিকে টেকসই পথে তুলতে আন্তর্জাতিক সংযোগের বিকল্প নেই—এই বাস্তবতা তাদেরও জানা।
‘বিজয়’–কাহিনি না ‘স্বীকৃতির প্রচার’? (Afghan Taliban)
বর্ষপূর্তি ঘিরে রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানকে অনেকেই দেখছেন ‘শাসন–স্বীকৃতির’ এক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে—দেশীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্য, বৈশ্বিকভাবে স্থিতিশীল অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা(Afghan Taliban)। তবে নারীদের অনুষ্ঠানমঞ্চে নিষেধাজ্ঞা, মাধ্যমিকোত্তর শিক্ষায় বাধা ও কর্মজীবনে অসাম্য—এই বাস্তবতাগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে বড় প্রশ্নচিহ্ন।
চতুর্থ বর্ষপূর্তির কলরব তালিবান শাসনের শক্তি–প্রদর্শনের এক মুখ, কিন্তু আফগান সমাজ–অর্থনীতির সংকট, মানবিক চাহিদা এবং বিশেষত নারীর অধিকার–প্রশ্নের উত্তর এখনও অনির্ধারিত। ‘প্রশাসনিক পরিবর্তন’–এর ইঙ্গিত বাস্তবে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে—তা নির্ধারণ করবে পরবর্তী পথরেখা। উদ্যাপনের উল্লাস পেরিয়ে আফগানিস্তানের সামনে তাই মূল প্রশ্ন দু’টি—স্থিতিশীলতা কি নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সহাবস্থান করবে, এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালিবান কি নীতিগত শিথিলতায় যাবে? সময়ই বলবে।