Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার পরিচয় বলতে গেলে অনেক নাম উঠে আসে (Howrah Bridge)—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ডাকশিনেশ্বর কালীমন্দির, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম কিংবা প্রেসিডেন্সি কলেজ। তবে শহরের জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা যে স্থাপত্য, সেটি নিঃসন্দেহে হাওড়া ব্রিজ। হুগলি নদীর বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ইস্পাত-দৈত্য শুধু কলকাতার নয়, সমগ্র বাংলার আবেগ, গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
সেতুর জন্মকথা (Howrah Bridge)
১৯শ শতকের শেষভাগে হুগলি নদী পেরিয়ে হাওড়া ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত ছিল ভীষণ কষ্টকর (Howrah Bridge)। নৌকাই ছিল প্রধান ভরসা। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার স্যার ব্র্যাডফোর্ড লেসলি প্রথম একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও আর্থিক টানাপোড়েনে প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে দেরি হয়। অবশেষে ১৯৩০-এর দশকে বিখ্যাত স্থাপত্য সংস্থা Rendell, Palmer & Tritton সেতুর নকশা তৈরি করে। ১৯৩৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং টানা আট বছরের শ্রমে ১৯৪৩ সালে সম্পূর্ণ হয় এই অনন্য ক্যান্টিলিভার ব্রিজ।
পুরো সেতু নির্মাণে ব্যবহার হয়েছিল প্রায় ২৬,০০০ টন ইস্পাত। এর মধ্যে অধিকাংশই এসেছিল টাটা স্টিলের মাধ্যমে। খরচ হয়েছিল প্রায় ৩.৩৩ কোটি টাকা—যা সেই সময়ে এক বিরাট অঙ্ক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নাট-বল্টু ছাড়াই একে দাঁড় করানো হয়েছিল; নিখুঁত রিভেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। দৈর্ঘ্যের বিচারে তখন এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্যান্টিলিভার সেতু ছিল।
যুদ্ধের আগুনে অক্ষত বিস্ময় (Howrah Bridge)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, ১৯৪২ সালে জাপানি বিমানবাহিনী কলকাতায় বোমা বর্ষণ করে। কলকাতার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আশ্চর্যের বিষয়, প্রধান লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও হাওড়া ব্রিজ অক্ষত থাকে। পরে ড্রেজিং চলাকালে নেটাজি সুভাষ বন্দরে উদ্ধার হওয়া একটি অবিস্ফোরিত বোমা আজও মণিকতলা কলকাতা পুলিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। যুদ্ধের উত্তাপ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়—সবকিছুকেই পরাজিত করেছে এই ব্রিজ।
মানুষের অসচেতনতার হুমকি (Howrah Bridge)
প্রকৃতি ও যুদ্ধ হার মানলেও মানুষের অসচেতনতা আজ বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের (KoPT) প্রধান প্রকৌশলী এ কে মেহরা লক্ষ্য করেন, ব্রিজের হ্যাঙ্গার বেসে মোটা গুটখা ও পানের আস্তরণ জমে রয়েছে। চুন, লবণ ও থুথুর সংমিশ্রণে তৈরি রাসায়নিক বিক্রিয়া ধাতব অংশ ক্ষয় করছে। সমস্যার সমাধানে KoPT ইস্পাতের প্লেট বদলে ফাইবারগ্লাসের ধোয়াযোগ্য আবরণ বসাতে শুরু করে। তবুও আজও সচেতনতার অভাবে একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে গুটখার দাগ দেখিয়ে ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছড়ায়। কেউ মজার ছলে মন্তব্য করেন—“Ajay Devgn supremacy”, “Power of 5 rupees”, আবার অনেকে কঠোর ভাষায় বলেন—অভ্যাসের কারণে এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিদিনের জীবনরেখা (Howrah Bridge)
আজকের দিনে হাওড়া ব্রিজ শুধু একটি স্থাপত্য বিস্ময় নয়, বরং কলকাতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক রক্তস্রোতের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন গড়ে দেড় লক্ষ যানবাহন এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ পথচারী এই সেতু ব্যবহার করেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাখো মানুষের অফিসযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে এই ব্রিজ। বলা যায়, হাওড়া ব্রিজ ছাড়া কলকাতার জীবন এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না।
সংস্কৃতি, সিনেমা ও শিল্পকলায় হাওড়া ব্রিজ
হাওড়া ব্রিজ শুধু যাতায়াতের অবলম্বন নয়; এটি বাঙালির শিল্প-সাহিত্যেরও প্রিয় বিষয়। অসংখ্য সিনেমা, সাহিত্য, গান ও চিত্রকর্মে ব্রিজটির ছবি ধরা পড়েছে। বিশেষত ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হাওড়া ব্রিজ’ সিনেমা নামটিকে জনপ্রিয়তার নতুন মাত্রা দেয়। পরে আরও বহু হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে এই সেতু রোম্যান্স, অ্যাকশন ও নস্টালজিয়ার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
রাতের আলোয় সজ্জিত হাওড়া ব্রিজের সৌন্দর্য দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকেরা ভিড় জমান। আলোর ঝলকানিতে হুগলির জলে ব্রিজের প্রতিবিম্ব কলকাতার রাতকে আরও রোমান্টিক করে তোলে।
আরও পড়ুন: Kolkata Metro New Route: কলকাতায় মেট্রোর নতুন রুটের সূচনায় মোদী, কোন রুটের ভাড়া কত?
ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের
হাওড়া ব্রিজ আজ ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শহরের প্রাণস্পন্দন। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও মানুষের অসচেতন আচরণ যদি বন্ধ না হয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি অচিরেই মারাত্মক আকার নিতে পারে। তাই প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। গুটখা, থুতু কিংবা অন্য কোনও ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বিরত থাকা শুধু নিজের স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্য রক্ষার দিক থেকেও অত্যন্ত জরুরি।