Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: পৃথিবীর এই রহস্যময় ২৬ সেকেন্ড অন্তর অন্তর স্পন্দন বা কম্পন আসলে বিজ্ঞানের কাছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এক অমীমাংসিত ধাঁধা। একে বলা হয় “মাইক্রোসিজম” (Microseism)। সাধারণ ভূমিকম্পের মতো এটি হঠাৎ ঘটে না, বরং এক নিয়মিত ছন্দে ফিরে ফিরে আসে। ভূকম্পবিদেরা একে পৃথিবীর হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তুলনা করেন।
রহস্যময় স্পন্দনের আবিষ্কার! (Microseism)
১৯৬০-এর দশকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লামন্ট-ডোহার্টি ভূতাত্ত্বিক গবেষণাগারের ভূতত্ত্ববিদ জ্যাক অলিভার প্রথমবারের মতো এই কম্পন নথিভুক্ত করেন। তিনি ভূকম্পন যন্ত্রে এক অদ্ভুত ছন্দময় তরঙ্গ লক্ষ্য করেছিলেন, যা পৃথিবীর ভেতর থেকে আসছে বলে মনে হয়। তখনকার যন্ত্রপাতি উন্নত ছিল না, তাই অলিভার কেবল এটিকে ‘অস্বাভাবিক শব্দ’ হিসেবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মাইক্রোসিজম ভূকম্পবিদদের কাছে এক নতুন অনুসন্ধানের দ্বার খুলে দেয়।
উৎস খোঁজার প্রচেষ্টা! (Microseism)
বহু দশকের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এর উৎস খুঁজে পেয়েছেন আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে, বিশেষ করে গিনি উপসাগরের বাইট অব বনি অঞ্চলে। সেখানেই পৃথিবী যেন এক ছন্দময় ঢোল বাজাতে থাকে।
গবেষকদের মতে, এ ঘটনার সম্ভাব্য দুটি কারণ হতে পারে:
- সাগরের ঢেউয়ের ধাক্কা (Microseism)
- মহাসাগরের ঢেউ যখন মহাদেশীয় শেলফের প্রান্তে এসে ধাক্কা খায়, তখন সেই বিশাল শক্তি তলদেশে প্রতিফলিত হয়ে ভূত্বকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
- শেলফ একপ্রকার প্রাকৃতিক ড্রামের মতো কাজ করে। যেমন বিভিন্ন ড্রামের গায়ে আঘাত করলে ভিন্ন ভিন্ন সুর ওঠে, তেমনি শেলফের বিশেষ আকৃতি এমন একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক তৈরি করতে পারে, যা পৃথিবীর ভেতর ছড়িয়ে পড়ে।
- এই ব্যাখ্যাকে অনেক ভূতত্ত্ববিদ সবচেয়ে যৌক্তিক মনে করেন।
- আগ্নেয়গিরির প্রভাব (Volcanic Hypothesis):
- বাইট অব বনি অঞ্চলের কাছেই আছে সাও টোমে দ্বীপের আগ্নেয়গিরি।
- আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরে গ্যাস, লাভা ও শিলার গতিবিধি থেকে ছন্দময় ভূকম্পন তৈরি হতে পারে।
- জাপানে একই ধরনের আগ্নেয় মাইক্রোসিজম নথিভুক্ত হওয়ায় গবেষকরা মনে করেন, হয়তো এখানেও আগ্নেয় কারণ সক্রিয়।
কেন এত বছরেও সমাধান হয়নি? (Microseism)
- বড় ভূকম্পন বেশি প্রাধান্য পায়: ভূমিকম্পের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা গবেষকদের জন্য সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে। তুলনায় এই ২৬ সেকেন্ডের স্পন্দন জীবনঘাতী নয়, তাই গবেষণা তেমন গভীরভাবে হয়নি।
- অত্যন্ত সূক্ষ্ম ঘটনা: সাধারণ ভূকম্পনের তুলনায় এই মাইক্রোসিজম অনেক দুর্বল। তাই সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা কঠিন।
- অবস্থান নির্ধারণের জটিলতা: যদিও উৎস অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে সুনির্দিষ্টভাবে কোন প্রক্রিয়া দায়ী—সাগরের ঢেউ নাকি আগ্নেয়গিরি—এখনও পরিষ্কার নয়।
নতুন দিক: পৃথিবীর নীরব সময় (Microseism)
২০২০ সালের বৈশ্বিক লকডাউনের সময়, যখন শিল্প, পরিবহন ও মানবিক কার্যকলাপ প্রায় থেমে গিয়েছিল, তখন ভূকম্পন যন্ত্র পৃথিবীর “শান্ত” অবস্থাকে রেকর্ড করে। এই বিরল সময়ে ভূতত্ত্ববিদরা আরও সূক্ষ্মভাবে ২৬ সেকেন্ডের স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন। একইভাবে, প্রতিবছর বড়দিনের আগের কয়েক দিন পৃথিবী ভূকম্পনগতভাবে কিছুটা নীরব থাকে, যা গবেষণার জন্য আদর্শ সময়।
আরও পড়ুন : India Pakistan Conflict : ভারত-পাকিস্তানকে পরমাণু যুদ্ধ থেকে ‘বাঁচিয়েছিলেন’, দাবি ট্রাম্পের
রহস্য এখনো জীবিত (Microseism)
এখনও বিজ্ঞানীরা চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেননি—পৃথিবীর এই ধ্রুব স্পন্দন সমুদ্রের ঢেউয়ের ড্রাম বাজানো, নাকি আগ্নেয়গিরির শ্বাসপ্রশ্বাস। তবে যাই হোক না কেন, এটি প্রমাণ করে পৃথিবী কতটা জীবন্ত, আর আমাদের বিজ্ঞানের কাছে এখনো কত কিছু অজানা রয়ে গেছে।