Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: সন্তানকে ঘিরে পরিবারের অনেক আনন্দ উৎসব লেগে থাকে (Postpartum Depression)। তাকে নিয়ে প্রতিদিনের ব্যস্ততায় দিন চলে যায়। মায়ের কাছে সন্তান কি! তার আলাদা করে কোন ব্যাখ্যা হয় না, কিন্তু সেই মা যখন তার নিজের সন্তানকে খুন করে?

মাত্র ৪৫ দিন বয়স। সদ্যোজাত শিশুর আগমন ঘিরে পুরো পরিবার আনন্দে ভাসছিল। প্রতিটি মুহূর্তে একসঙ্গে থাকছিলেন সকলে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই নিঃশব্দে বাড়তে থাকে এক নারীর মানসিক যন্ত্রণা। মা হয়ে ওঠার পর তিনি চরম অবসাদে (Postpartum Depression) ভুগছিলেন। সেই অবসাদেরই ভয়ঙ্কর রূপ একদিন গোটা পরিবারকে আতঙ্কে নিমজ্জিত করল।
দ্বারকাপুরীর নৃশংসতা (Postpartum Depression)
মধ্যপ্রদেশের দ্বারকাপুরী এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। বাড়ির বাইরে জামাকাপড় শুকোতে গিয়েছিলেন সদ্যোজাত শিশুর পিসি। হঠাৎ শিশুর মায়ের ভয়াবহ চিৎকার শুনে তিনি ছুটে আসেন। ঘরে ঢুকেই তিনি দেখেন, ৪৫ দিনের শিশুর গলা কাটা দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। হাতেনাতে ধরা পড়েন শিশুর মা— তাঁর হাতেই রক্তের দাগ।
পুলিশে খবর দেওয়া হলে তদন্ত শুরু হয়। পুলিশের জেরায় অবশেষে ভেঙে পড়ে শিশুহত্যার কথা স্বীকার করে নেন ওই মা। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩ নম্বর ধারায়। পুলিশি সূত্রে জানা যায়, যুবতী সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। সন্তান জন্মের পরেও সেই অবসাদ আরও গভীর হয়। পরিবারের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। ওষুধ খেতেন কিনা বা চিকিৎসাধীন ছিলেন কিনা— তা এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইন্দোরে জন্মদিনেই মৃত্যু (Postpartum Depression)
এই ঘটনা সামনে আসার কয়েকদিন আগেই, ইন্দোরের তেজাজি নগরে ঘটেছিল আরেক নৃশংসতা। জন্মদিন উপলক্ষে সাজানো বাড়ি, কেক, মোমবাতি— সবকিছুই আনন্দের আবহ তৈরি করেছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব আনন্দ শোকের আবহে পরিণত হয়।
জানা যায়, জন্মদিনের দিনেই কান্নাকাটি করছিল দুই বছরের শিশুকন্যা। বিরক্ত হয়ে রাগের মাথায় মা ঘর থেকে লাঠি এনে প্রথমেই মাথায় আঘাত করেন শিশুটিকে। সজোরে আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মেয়েটি। সেখানেই মৃত্যু ঘটে।
অফিস থেকে ফেরা শিশুর বাবা ঘরে ঢুকেই দেখেন কন্যার নিথর দেহ। স্ত্রীর আচরণে সন্দেহ হতেই পুলিশে খবর দেন তিনি। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। শিশুকন্যার মাকে গ্রেপ্তার করে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে— এটি কি শুধুই মানসিক অবসাদ, নাকি দাম্পত্য কলহ কিংবা কন্যাসন্তানকে অপছন্দ করার মতো সামাজিক মনোভাবের ফলাফল।
আহমেদাবাদের ট্র্যাজেডি
এপ্রিল মাসে গুজরাটের আহমেদাবাদের অম্বিকানগর এলাকায় এক মায়ের কাহিনি কাঁপিয়ে দেয় দেশকে। ২২ বছরের করিশ্মা বাঘেল হঠাৎই পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন— তাঁর তিন মাসের সন্তান নিখোঁজ। পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করে। অবশেষে বাড়ির ভূগর্ভস্থ জলের ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয় শিশুর মৃতদেহ।
পুলিশি জেরায় প্রথমে করিশ্মা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে ফাঁস হয়ে যায় সত্য। জানা যায়, বিরক্তির বশেই তিনি নিজ সন্তানকে ট্যাঙ্কে ফেলে খুন করেছিলেন। সন্তান জন্মের আগে থেকেই নানা শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন করিশ্মা। সন্তান কান্না করলেই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন। সেই বিরক্তিই তাঁকে নৃশংস সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
মা কেন খুন করেন?
মাতৃত্ব কি সবসময় আনন্দময়? সমাজে মা হওয়াকে পবিত্র ও পরম সুখের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও বাস্তব অনেক সময় ভিন্ন। অনেক নারী প্রসব-পরবর্তী অবসাদে (Postpartum Depression) ভোগেন। একাকিত্ব, হরমোনজনিত পরিবর্তন, শারীরিক কষ্ট, দাম্পত্য সমস্যা— সব মিলিয়ে তৈরি হয় মানসিক অস্থিরতা।
সামাজিক চাপের ভূমিকা: কন্যাসন্তান জন্মালে অনেক পরিবারে এখনও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মা তখন নিজেকে অপরাধী ভেবে ফেলে, মানসিক চাপ বেড়ে যায়।
মানসিক রোগকে অবহেলা: ভারতীয় সমাজে মানসিক অসুস্থতাকে এখনও লজ্জার বিষয় মনে করা হয়। ফলে চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং পাওয়া যায় না।
রাগ ও হতাশার মুহূর্তে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত: শিশুর কান্না, আর্থিক অসুবিধা, বা সঙ্গীর সহানুভূতির অভাব— সব মিলে অনেক সময় মা চরম সিদ্ধান্ত নেয়।
আরও পড়ুন: Mosquito: প্রাণ বাঁচাতে মশাকেই অস্ত্র বানাল বিজ্ঞানীরা?

মানসিক সংকটের প্রতিফলন!
মধ্যপ্রদেশ, ইন্দোর, আহমেদাবাদ— তিনটি জায়গার তিনটি ঘটনা ভিন্ন হলেও, সবার মূলে রয়েছে মানসিক অসুস্থতা, অবসাদ ও সামাজিক চাপ।
- নবজাতক বা ছোট সন্তানের মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে।
- পরামর্শদান, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে।
- আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি দরকার সমবেদনা ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা।
- মা যখন খুন করেন, সেটি শুধুই অপরাধ নয়— সেটি এক ভয়ঙ্কর সামাজিক ও মানসিক সংকটের প্রতিফলন।