Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: বিশ্বজুড়ে ২০ আগস্ট পালিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড মস্কিটো ডে’ বা বিশ্ব মশা দিবস(World Mosquito Day)। দিনটি ক্যালেন্ডারে কেবল একটি প্রচারাভিযানের তারিখ নয়; এটি স্মরণ করায় এমন এক বৈপ্লবিক বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে, যা জনস্বাস্থ্যে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ১৮৯৭ সালের এই দিনে ব্রিটিশ–ভারতীয় চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রস ম্যালেরিয়া রোগের পরজীবীকে মশার শরীরে শনাক্ত করে দেখান—ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে মশার মাধ্যমে। তাঁর সেই আবিষ্কার এক শতাব্দীরও বেশি সময় জুড়ে রোগ দমন–নীতিতে পথ দেখাচ্ছে।
আবিষ্কারের পটভূমি (World Mosquito Day)
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ম্যালেরিয়া ছিল উপনিবেশিক ভারত ও আফ্রিকার মহাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। জ্বর, কাঁপুনি, অ্যানিমিয়া আর দুর্বলতায় লক্ষ-লক্ষ মানুষের প্রাণ যাচ্ছিল(World Mosquito Day)। রোগের কারণ নিয়ে নানা ধারণা ছিল—দূষিত বাতাস (মায়াজমা), জলাশয়, ঋতু—কিন্তু নিশ্চিত প্রমাণ হাতে ছিল না। এই অনিশ্চয়তার ভেতরেই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আর্মি মেডিক্যাল সার্ভিসে কর্মরত রোনাল্ড রস গবেষণায় ঝুঁকলেন। লক্ষ্য—ম্যালেরিয়ার প্রকৃত বাহক কে?
আলিপুর ও সেকেন্দ্রাবাদের ল্যাব থেকে বড় আবিষ্কার (World Mosquito Day)
রসের গবেষণার বড় অংশ ঘটে কলকাতার (তৎকালীন কলকাতা) আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে ও পরে সেকেন্দ্রাবাদে(World Mosquito Day)। তিনি রোগীর রক্ত, মশা, পাখি—সবকিছুর ওপর ধারাবাহিক পরীক্ষা চালান। ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট, তিনি ‘Anopheles’ গোত্রের একটি স্ত্রী মশার পেটের ভেতর ম্যালেরিয়ার ‘প্লাজমোডিয়াম’ পরজীবীর স্পোরোজোয়াইট ধাপ দেখতে পান। মশা যখন রক্ত খায়, তখন এই পরজীবী মানুষে প্রবেশ করে—এটাই ছিল ধাঁধার শেষ টুকরো। পরবর্তীতে তিনি পাখির ম্যালেরিয়া নিয়েও মডেল তৈরি করেন, চক্রের বিভিন্ন ধাপ দেখান এবং রোগ–সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট নকশা আঁকেন।

আরও পড়ুন : US Tariff On India : ভারতের উপর তুলো আমদানিতে শুল্ক মকুব ট্রাম্পের ! স্বস্তি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের
বৈজ্ঞানিক প্রভাব ও নোবেল সম্মান (World Mosquito Day)
রসের প্রমাণভিত্তিক কাজ জনস্বাস্থ্যে বিপ্লব ঘটায়(World Mosquito Day)। শহর পরিকল্পনায় ড্রেনেজ–ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, কীটনাশক প্রয়োগ, মশারি ও স্ক্রিন–ব্যবহার—সবকিছুই নতুন করে ভাবা হয়। ১৯০২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তিনি; এই পুরস্কার কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, পুরো ‘ট্রপিকাল মেডিসিন’ শাখাকে বৈধতা দেয়। এর পরেই লিভার–এরিথ্রোসাইট–মশা—এই ত্রিমাত্রিক চক্র বোঝার ওপর ভিত্তি করে ‘ভেক্টর কন্ট্রোল’ বিশ্বস্বাস্থ্যের প্রধান কৌশলে পরিণত হয়।
কেন ২০ আগস্ট ‘বিশ্ব মশা দিবস’? (World Mosquito Day)
রস নিজে জীবিত থাকাকালেই ২০ আগস্টকে স্মারক–দিন হিসেবে চিহ্নিত করার আহ্বান দেন—কারণ সেদিনই তিনি মশায় ম্যালেরিয়ার পরজীবী শনাক্ত করেন(World Mosquito Day)। এরপর থেকে চিকিৎসা–মহল, পাবলিক হেলথ সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিনটিকে ব্যবহার করছে সচেতনতা বাড়াতে: কোন মশা কোন রোগ ছড়ায়, কীভাবে উৎস–নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আর স্থানীয় সম্প্রদায় কীভাবে অংশ নেয়। আজকের দিনে এই দিবসের বার্তা আরও বিস্তৃত—ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, ইয়েলো ফিভারসহ মশাবাহিত বহু রোগের প্রতিরোধে যুক্তিবাদী, প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপই একমাত্র পথ।

আরও পড়ুন : India China Relations : ট্রাম্পের দাদাগিরি রুখতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করার পথে বেজিং
ভারতের প্রেক্ষাপট (World Mosquito Day)
ভারত ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় গত দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখিয়েছে—স্ক্রীনিং, দ্রুত ডায়াগনস্টিক টেস্ট, কার্যকর অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ওষুধ, আইআরএস (ইন্ডোর রেসিডুয়াল স্প্রে), লার্ভা–নিয়ন্ত্রণ, এবং এলএলআইএন (দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক–যুক্ত মশারি) বণ্টন ইত্যাদির কারণে বহু রাজ্যে কেস কমেছে। তবু মৌসুমি বৃষ্টিপাত, শহুরে জলাবদ্ধতা, নির্মীয়মাণ প্রকল্পের অপরিকল্পিত সাইট, এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসমতা—এসব কারণে কিছু জেলায় সংক্রমণ ওঠানামা করে। রসের আবিষ্কারের সূত্রেই আমরা জানি, ‘Anopheles’–এর প্রজননস্থল শুকাতে পারলে সংক্রমণ–শৃঙ্খল ভাঙা যায়। তাই উৎস–নিয়ন্ত্রণই মূলমন্ত্র: পানি জমতে না দেওয়া, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, ও খোলা জলাধার ঢেকে রাখা।
রসের শিক্ষা—প্রমাণের পথে নীতি (World Mosquito Day)
রোনাল্ড রসের গবেষণা এক কঠোর বার্তা দেয়, অনুমান নয়, তথ্য–প্রমাণই নীতি নির্ধারণের ভিত্তি(World Mosquito Day)। তিনি অসংখ্য ব্যর্থতার পর ফল পেয়েছেন, যাতে আছে দৃঢ়তা, ল্যাব–শৃঙ্খলা, ও মাঠ–গবেষণার সংমিশ্রণ। আজকের দিনে, যখন জলবায়ু পরিবর্তন আবহাওয়াকে অনিশ্চিত করছে, মশার প্রজনন–চক্র বদলাচ্ছে, এবং শহরায়ন নতুন হটস্পট বানাচ্ছে—রসের পদ্ধতিগত নিরীক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। স্থানীয় ডেটা, মানচিত্রভিত্তিক নজরদারি, আর কমিউনিটি–অংশগ্রহণ—এই ত্রিসূত্রিই এখনকার লড়াইয়ের আধার।
ব্যক্তি, পরিবার ও সম্প্রদায় (World Mosquito Day)
বিশ্ব মশা দিবসে (World Mosquito Day) সচেতনতার কয়েকটি সরল সূত্র,
- উৎস–নিয়ন্ত্রণ: বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণস্থান, টব, টায়ার, কুলার—যেখানেই জল জমে, সাপ্তাহিক পরিষ্কার করুন।
- শারীরিক সুরক্ষা: সন্ধ্যা–রাতে ফুল হাতা জামা, লুজ–ফিটিং পোশাক, দরজা–জানালায় স্ক্রিন, ঘুমের সময় মশারি।
- সমাজভিত্তিক পদক্ষেপ: ওয়ার্ড–স্তরে ড্রেন–ডিসিল্টিং, কঠিন–বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ও জন–অভিযান; স্কুল–কলেজে স্বাস্থ্য–শিক্ষা।
- লক্ষণ দেখলে দ্রুত পরীক্ষা: হঠাৎ জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, দুর্বলতা—নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে টেস্ট করান; দ্রুত চিকিৎসা নিলে জটিলতা কমে।
রসকে শুধু বিজ্ঞান নয় , সাহিত্যেও অনুপ্রেরণা (World Mosquito Day)
রস কেবল চিকিৎসক নন, তিনি লেখক–কবিও ছিলেন(World Mosquito Day)। বিজ্ঞানের নিবিড় অনুশীলন ও মানবিক বোধ তাঁর কাজকে গভীরতা দিয়েছে। একশো বছরেরও বেশি আগে তিনি যে ‘ভেক্টর–বর্ন ডিজিজ’–এর ভাষা তৈরি করেছিলেন, তা আজও নীতিনির্ধারণে মানদণ্ড। বিশ্ব মশা দিবসে তাই স্মরণ করি—বিজ্ঞানের ছোট একটি পর্যবেক্ষণও কেমন করে কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
২০ আগস্টের তাৎপর্য কেবল স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যতের রূপরেখা(World Mosquito Day)। রোনাল্ড রস (Ronald Ross) দেখিয়েছিলেন, রোগের রহস্য খুলতে হলে প্রকৃত বাহককে চিহ্নিত করতেই হবে। তাঁর আবিষ্কার আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে প্রতিরোধের সুসংগঠিত সরঞ্জাম—উৎস–নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, ও সময়মতো চিকিৎসা। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের যুগে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি রয়ে গেছে—কিন্তু রসের দেখানো পথে বিজ্ঞান, নীতি ও নাগরিক উদ্যোগ একসাথে এগোলে সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশ্ব মশা দিবসে তাই উচ্চারিত হোক একসুরে বার্তা: তথ্য–প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ, সবার অংশগ্রহণ—ম্যালেরিয়ামুক্ত ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।