Last Updated on [modified_date_only] by Ananya Dey
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল : হাইকোর্টে আবারও ধাক্কা রাজ্য ও স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC)। এসএসসি-এর নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত ‘দাগি’ বা অযোগ্যরা অংশ নিতে পারবেন না। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্যের সিঙ্গেল বেঞ্চের রায় বহাল রেখেই নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চের। এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত ‘দাগি’ যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন অবিলম্বে বাতিল করতেও নির্দেশ ডিভিশন বেঞ্চের। এক্ষেত্রে সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশে ডিভিশন বেঞ্চ কোনওরকম হস্তক্ষেপ করবে না বলেই জানিয়ে দিল। অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। গত ৩০ মে এসএসসি যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল, তাকে সামনে রেখেই নিয়োগপ্রক্রিয়া চলবে।
গত শুনানিতে হাইকোর্টে প্রশ্নের মুখে রাজ্য (SSC)
‘কেন অযোগ্যদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে কমিশন?’ গত শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চের একাধিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল রাজ্য ও এসএসসি-কে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য নির্দেশ দিয়েছিলেন এসএসসির নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুধু যোগ্যরা পরীক্ষায় বসতে পারবেন। চিহ্নিত অযোগ্য বা ‘দাগি’রা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া অংশ নিতে পারবেন না। এখনও পর্যন্ত যে সমস্ত চিহ্নিত অযোগ্যরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অযোগ্যদের বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া করতে হবে সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রাজ্যে এবং স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC)। কিন্তু গত বুধবার সেই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চের একাধিক প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্য ও কমিশন। কেন রাজ্য ও কমিশন অযোগ্যদের পাশে দাঁড়াতে চাইছেন? সেই প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি সৌমেন সেন। তার স্বপক্ষে জোড়া কারণ দেখান কমিশনের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ডিভিশন বেঞ্চে ‘অযোগ্যদের’ পক্ষে সওয়াল রাজ্যের (SSC)
মামলার প্রথম থেকেই যোগ্যদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া অংশ নেওয়ার পক্ষে জোর সওয়াল করেন রাজ্য ও এসএসসি’র (SSC) আইনজীবী। সিঙ্গল বেঞ্চেও অযোগ্যদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রাজ্য ও কমিশন। ডিভিশন বেঞ্চে গত শুনানিতে পর্ষদের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও চিহ্নিত অযোগ্যদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পক্ষে জোড় সওয়াল করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, চিহ্নিত অযোগ্যদের চাকরি বাতিল এবং বেতনের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সব দাগি বা অযোগ্য প্রার্থীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেনি। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, প্যানেল বহির্ভূতদের, যাদের প্যানেলের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছিল, ওএমআর শিটে কারচুপি করে চাকরি পেয়েছেন যাঁরা, তাঁদের। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কোথাও বলা হয়নি, ‘দাগি’ অযোগ্যরা নতুন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না, তা কোথাও বলা হয়নি।
কমিশনের আইনজীবীর যুক্তি
বিচারপতি সৌমেন সেন তখন প্রশ্ন করেন, যোগ্য-অযোগ্যদের মধ্যে পার্থক্য করছেন না কেন? তার উত্তরে কমিশনের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সব চিহ্নিত অযোগ্যদের টাকা ফেরত দিতে বলেছিল।বয়সে ছাড় দু’টি শ্রেণী পাবে।তারা অসফল। তাই তারা যোগ্য নাকি দাগি অযোগ্য, সেই প্রশ্নই আর আসে না। গোটা প্যানেল বাতিল হলে কারা যোগ্য-অযোগ্য আর কোনও মানেই হয় না।’
কেন ‘চিহ্নিত অযোগ্যদের’ পাশে দাঁড়াচ্ছে কমিশন ?
তখন বিচারপতি সৌমেন সেন কমিশনের আইনজীবির উদ্দেশ্যে তিনটি প্রশ্ন করেন।এক, এসএসসি কেন ‘দাগি’ বা ‘চিহ্নিত অযোগ্যদের’ পাশে দাঁড়াচ্ছে? দুই, ‘চিহ্নিত দাগি’-দের নিয়ে সওয়াল করার মতো জায়গায় কি কমিশন আছে? তিন, ‘চিহ্নিত দাগি’-দের নিয়োগে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে কমিশন কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে? আমাকে বোঝান, কেন আপনারা যে আবেদন করেছেন, সেটা সত্য।’
কমিশনের জোড়া যুক্তি
আদালতের এই তিন প্রশ্নে দু’টি কারণ তুলে ধরেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম যুক্তি ছিল, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারা অংশ নিতে পারবেন আর কারা পারবেন না, সেই নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। প্যানেল বহির্ভূত, মেয়াদ উত্তীর্ণ প্যানেল থেকে এবং সাদা খাতা জমা দিয়ে যাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের ‘দাগি’ বলে চিহ্নিত করেছিল হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে মান্যতা দিয়েছে। তার বাইরে আর কেউ ‘দাগি’ বলে চিহ্নিত হননি। এক্ষেত্রে হাইকোর্টের ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্দেশ চাইছেন তাঁরা। কারা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে পারবেন এবং কারা পারবেন না, তা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে চাইছে এসএসসি। সেই কারণেই সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় যুক্তি, একই অপরাধে জোড়া শাস্তি হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চিহ্নিত অযোগ্যদের চাকরি বাতিল হয়েছে। তাঁদের বেতন ফেরত দিতে হচ্ছে। তাহলে কেন তাদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না? একটি অপরাধের জন্য একাধিক বার শাস্তি হতে পারে না।
তাছাড়া ২০১৬ সালের পর ২০১৯ সালের রুল আসে। সেটা কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। তাই চিহ্নিত দাগী প্রার্থীদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হোক। সিঙ্গেল বেঞ্চের শুনানিতেও একই যুক্তি দিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আরও বলেন, ‘২০১৬ থেকে ২০২৫ প্রায় ৯ বছর কেটে গিয়েছে। প্রজন্ম বদলেছে। তাই এদের সুযোগ দেওয়া উচিত। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই যখন বাতিল করা হয়েছে তাহলে তো চিহ্নিত দাগী শিক্ষকরা যাদের পড়িয়েছে, সেই ছাত্র-ছাত্রীদের বাতিল করতে হবে।’ শুধু তাই নয় আদালতে কমিশন এই দাবি করে যে যদি চিহ্নিত অযোগ্য বা দাগিদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া অংশ নিতে না দেওয়া হয় তাহলে ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যারা সফল হতে পারেননি তাদেরও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া যাবে না। কমিশনের এই অপ্রত্যাশিত দাবী শুনে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিল আদালত।
বিচারপতি সৌমেন সেনের পর্যবেক্ষণ
তখন বিচারপতি সৌমেন সেন তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘চিহ্নিত অযোগ্যরা যদি জালিয়াতি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পান, তা হলে তার ফলও ভুগতে হবে।’ সেইসঙ্গে বিচারপতি সেন প্রশ্ন করেন, ‘অযোগ্য হয়েও তিনি যেহেতু প্রায় দশ বছর শিক্ষকতা করলেন, তাতে তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তিনি শিক্ষক নিয়োগের এই পরীক্ষা বসতে পারেন, এটাই আপনার দাবি, তাই তো?’ তার উত্তরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি চাই অযোগ্যদেরও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দওয়া হোক।’
রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলের সওয়াল
রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্তও সওয়াল করেন, সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি চাকরি ‘দাগি’ অযোগ্যদেরও মৌলিক অধিকার। নিয়োগে অংশ নিতে না দিলে তাঁদের ভবিষ্যতের ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়ে যাবে। কিন্তু রাজ্য ও কমিশনের এই যুক্তি ধোপে টিকলো না। অযোগ্যদের বাদ দিয়েই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো ৩০ জুনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মেনে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্যের সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করল না ডিভিশন বেঞ্চ।
রাজ্য, এসএসসি-এর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বঞ্চিত চাকরি প্রার্থীদের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য বলেন, যখন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য ও কমিশন আবেদন করেছিল, তখন একবারের জন্যও সেখানে তারা অযোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের চাকরি বহাল রাখা বা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়ার আবেদন করেনি। গত ৩০ মে শিক্ষা দফতর যে নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে, সেখানেও এই বিষয়ে ধোঁয়াশা রাখা হয়েছিল। আবার হাইকোর্টে তারা অযোগ্যদের হয়ে সওয়াল করেছে। রাজ্য এবং স্কুল সার্ভিস কমিশন এক-এক জায়গায় এক-এক রকম অবস্থান নিয়েছে। বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্যের দাবি, আসলে রাজ্য এবং স্কুল সার্ভিস কমিশন খুব ভালো করেই জানতো যে অযোগ্যরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনভাবেই অংশ নিতে পারবে না। কারণ, সুপ্রিমকোর্ট যখন পরবর্তী নির্দেশে, যাঁদের অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা যায়নি, তাঁদের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিল, সেখানেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, অযোগ্যরা আর কোনও সুযোগ পাবেন না। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিমকোর্ট, বারবার কমিশনের কাছে যোগ্য-অযোগ্যের তালিকা চেয়েছিল। কিন্তু সেই তালিকা দিতে পারিনি রাজ্য ও কমিশন। তাই সুপ্রিমকোর্ট গোটা প্যানেল বাতিল করে দিয়েছিল। এবং যাদের অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল, তাদের চাকরি বাতিলের পাশাপাশি বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।