Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল : পৃথিবীর সবথেকে উচু পার্বত্য যুদ্ধক্ষেত্র হল কার্গিল। কার্গিলের নাম শুনলেই নজরে আসে বরফে ঢাকা চূড়া, পাতলা বাতাস আর মানুষের হাতের নাগালের বাইরে থাকা কঠিন ভূগোল(Kargil Warzone)। লাদাখ এবং জম্মু অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই এলাকা পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে কয়েক হাজার ফুট উপরে জীবনযাপন করা, রসদ সরবরাহ বজায় রাখা এবং সামরিক কার্যক্রম চালানো এক কঠিন প্রক্রিয়া। তবু ভারতীয় সেনা দীর্ঘ দশকের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জনশক্তি ও রসদ সাপ্লাই ধরে রাখে সারা বছর। কিন্তু প্রশ্ন এই অসাধ্য সাধন কীভাবে করে ভারতীয় সেনা?
প্রকৃতি এবং চ্যালেঞ্জ (Kargil Warzone)
কার্গিলের যে এলাকায় মোতায়েন রয়েছে ভারতীয় সেনা (INDIAN ARMY) তার উচ্চতা প্রায় ১৬০০০ থেকে ১৮০০০ ফুট পর্যন্ত(Kargil Warzone)। এত উচ্চতায় শীতকালীন তাপমাত্রা মাইনাসের নিচে চলে যায়, বাতাস পাতলা হওয়ায় অক্সিজেনও কম থাকে এবং সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। তাছাড়া পাহাড়ি তুষারে ঢাকা এলাকায় সেতু ভাঙা বা তুষারধসের ঝুঁকি থাকে সবসময়। এসব কারণে এই এলাকায় মোতায়েন থাকা সৈন্যদের শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতি ও অপারেশনাল সক্ষমতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেনাদের থাকা ও দৈনন্দিন জীবন (Kargil Warzone)
কার্গিল ও তার আশেপাশের চেক পোস্টগুলোতে সেনাদের থাকার জন্য বিশেষ বাঙ্কার, কভার্ড ক্যান্টিন ও স্থানান্তর যোগ্য কনস্ট্রাকশন করা হয়(Kargil Warzone)। পাথর ও মাটি দিয়ে পাকা কাঠামো বানানো হয় যাতে তুষার এবং ঠাণ্ডা বাতাসের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাপ জেনারেটর, পোর্টেবল হিটিং সিস্টেম এবং নির্ধারিত স্টোরেজে ফুয়েল সংরক্ষণ করে গরম রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
সেনারা বিশেষ হাই অল্টিচিউড পোশাক এবং সরঞ্জাম ব্যবহার করেন(Kargil Warzone)। গরমের অতি-পুরু জ্যাকেট, স্ট্রং বুট, থর্মাল নকশা করা নীচের কাপড় এবং মোবাইল অক্সিজেন সিলিন্ডার সবসময় ব্যবহার করতে হয় সেনাদের। পাশাপাশি প্রত্যেক ইউনিটে মেডিকেল টিম থাকে যারা অতিরিক্ত উচ্চতার অসুস্থতা বা হাই এল্টিচিউড লংডর্স রোগের চিকিৎসা করে। নিয়মিত এক্লিমাটাইজেশন ট্রেনিং দিয়ে নতুন আনা জওয়ানদের শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শেখানো হয়। মানসিক চাপ সামলাতে মনোবৈজ্ঞানিক সাপোর্টও রাখা হয়।

আরও পড়ুন : Integrated Air Drop Test : গগনযান অভিযানে বড় সাফল্য! প্রথম ইন্টিগ্রেটেড এয়ার ড্রপ টেস্ট সম্পন্ন করল ইসরো
রসদ পৌঁছে দেওয়ার উপায় (Kargil Warzone)
রাস্তাঘাট ও ব্রড রোডস অর্গানাইজেশন
গ্রীষ্মকালে শ্রীনগর থেকে লেহ এবং কার্গিল পর্যন্ত সড়কপথ খোলা থাকে(Kargil Warzone)(Kargil Warzone)। ব্রড রোডস অর্গানাইজেশন বা BRO পাহাড় কাটার কাজ ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করে রুট সচল রাখার কাজ করে। ট্রাক কনভয়ে খাবার, জ্বালানি, কাঁটাছেঁড়া সরঞ্জাম ও কমব্যাট লজিস্টিক পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে শীতকালে বরফ ও তুষারধসের কারণে সড়ক প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তাই অন্যান্য উপায়ে নির্ভর করতে হয়।
বিমান ও হেলিকপ্টার
এয়ারলিফট কার্গিল অঞ্চলকে সরবরাহ দেওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বড় পরিবহন বিমান লেহ বা নিকটবর্তী এয়ারফিল্ডে রসদ পৌঁছে দেয়(Kargil Warzone)। সেখান থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে সরাসরি পোস্টে মালামাল পাঠানো হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর Mi-17, Chinook, Dhruv জাতীয় হেলিকপ্টার ছোট ও বড় জিনিসপত্র দ্রুত নিয়ে যেতে পারে। জরুরি চিকিৎসা বা মানুষ সরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও হতাৎ ব্যবস্থা হল এই এয়ারশিপিং।
লোকাল প্যাস ও মালপশু
যেসব জায়গায় হেলিপ্যাড নেই বা পথে গাড়ি ঢোাকা যায় না, সেখানে শেষ মাইলের জন্য খচ্চর, যাক বা অন্যান্য স্থানীয় মালপশু ব্যবহার করা হয়(Kargil Warzone)। পাশাপাশি পায়ে হেঁটে বা হ্যান্ড ক্যারিজে কুড়াল, গোলাবারুদ বা ওষুধ পাঠানো হয়। এটি ধীরপন্থী হলেও নির্ভরযোগ্য এক উপায়।
উইন্টার স্টকিং বা শীতকালীন মজুদ
কার্গিলের মতো অঞ্চলে পুরো বছর সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না। তাই গ্রীষ্মকালের আগে বড় পরিমাণে খাদ্য, জ্বালানি, ঔষধ, জেনারেটর ও গোলাবারুদ মজুদ করে রাখা হয়। স্টকিংয়ের পরিকল্পনা এতটাই গুরুত্বপূর্ন যে তা ব্যাহত হলে সামরিক কর্মকাণ্ড প্রভাবিত হতে পারে। স্টক সংরক্ষণের জন্য বিশেষ কোল্ড স্টোরেজ নয় বরং ঠাণ্ডা সহনশীল প্যাকিং ও সিল করা কন্টেইনার ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন : Maruti Suzuki : শুল্ক যুদ্ধের মাঝে স্বদেশি প্রচারে জোর! মারুতি সুজুকির ই-ভিতারা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
যোগাযোগ ও কভারেজ (Kargil Warzone)
কার্গিলে স্থায়ীভাবে কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক চালু রাখা কঠিন। স্যাটেলাইট ফোন, পোর্টেবল রেডিও এবং ট্যাকটিক্যাল কমিউনিকেশন ইউনিট ব্যবহার করে কমিউনিকেশন বজায় রাখা হয়। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ও ড্রোন প্রয়োগ করেও রুট ও নিরাপত্তা নজরদারি করা হয়(Kargil Warzone)।
লজিস্টিক প্ল্যানিং ও নিরাপত্তা (Kargil Warzone)
রসদ পৌঁছানোর কাজ কেবল লজিস্টিক নয়, এটি কৌশলগতও। চালান গোপনীয়তা বজায় রেখে নিরাপদ কনভয়ে পাঠানো হয়। রেখাযুক্ত ভাবে কনভয় চালানো, রুট পুনর্নিমাণ এবং পোস্ট-ডেলিভারি যাচাই লজিস্টিক কর্পস-এর দায়িত্ব। কোর অফ ইঞ্জিনিয়ার্স ও লজিস্টিক ইউনিট নিয়ম করে রুট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
মানবিক দিক ও মনোবল (Kargil Warzone)
ক্ষুদ্র ও নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিনোদন, মানসিক সহায়তা ও পরিবারিক যোগাযোগের ব্যবস্থা সেনাদের মনোবল বাড়ায়(Kargil Warzone)। রিজার্ভ অফিসাররা নিয়মিতভাবে ছুটি, চিঠি ও অনলাইন সংযোগ নিশ্চিত করে যাতে সৈন্যরা নিজেদের মানসিক সুষমা বজায় রাখতে পারে।
কার্গিলের মতো উচ্চ পার্বত্য যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় সেনার টিকে থাকা কেবল সাহসিকতার ফল নয়; এটি সুপরিকল্পিত লজিস্টিক, আধুনিক প্রযুক্তি, স্থানীয় সহায়তা ও কঠোর প্রশিক্ষণের সমন্বয়। সড়ক, বিমান, পশুপথ এবং গভীর স্টকিং—এই সব মিলিয়ে রসদ পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রতিদিন যে প্রচেষ্টা করা হয় তা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক দুর্লভ অবদান। কার্গিলের কড়া শর্তে সেনারা প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে, আর পিছনে থাকা লজিস্টিক যন্ত্রনা তাদের জন্য জীবনের বহনক্ষমতা করে তোলে।